Tuesday September 24, 2019
অতিথি কলাম
14 January 2019, Monday
মৃত্যুুু
আবু বকর সিদ্দিক
 
 

নব্বই বছর বয়সী মুন্সী আহসান উদ্দীন আজ তার জীবনের শেষ রাতটি পার করছেন। ঘরের বাইরে পূর্ণিমার আলো উপচে পড়ছে।কার্তিক মাসের মাঝাামাঝি সময়ের এ পূর্ণিমাটা শরতের উজ্জ্বল থোকা থোকা জ্যোৎস্নাকেও হার মানায়।বাইরের জ্যোৎস্নার সাথে পাল্লা দিয়ে ঘরের ভেতরটা যেন গভীর অন্ধকারে ঢেকে আছে।ঘরে যারা বসে আছে তাদের মুখগুলো আরো বেশি অন্ধকারাচ্ছন্ন।রাজ্জাক ডাক্তার এই অঞ্চলের সব চেয়ে দামী ও খ্যাতিমান চিকিৎসক।নদীর ওপারে প্রতাপনগরে তার বাড়ি।দূরত্ব নেহায়েত কম নয়।সপ্তাহে দু-দিন তিনি টাবুরে নৌকা করে এসে রোগী দেখে যান।এতে প্রায় সারাদিন লেগে যায়।আনা নেওয়া নৌকার ভাড়া আর ডাক্তারের ভিজিট মিলিয়ে মোটা অংকের টাকাই ব্যয় করতে হয় আহসানউদ্দীনের পরিবারকে।গত তিন বছর এটাই চলছে রুটিন মাফিকভাবে। তবে এবার ডাক্তার জবাব দিয়ে গেছেন, অবস্থা বেশি ভালো নয়,উনি যা খেতে চান সেটা আপনারা খাওয়ান। আজ পূর্ণিমা রাতে এসে তাঁর শরীরের অবস্থাটা যেন বেশিই খারাপ হয়ে উঠলো।

আহসান উদ্দীনের বড় পরিবার।চার ছেলে,পাঁচ মেয়ে আর নাতিপুতি মিলে সংসারটা তার বিশাল।ছেলেমেয়েরা সবাই এখন তাঁর বাড়িতে। ইশারায় পাশ পরিবর্তন করে দেয়ার কথা বললেন আহসান উদ্দীন।কথা বলার চেষ্টা করছেন কিন্তু শব্দ করতে পারছেন না।প্রায় পঞ্চাশ বছর আগে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়া নিজের মায়ের করুণ মুখটি যেন স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছেন তিনি। বাল্যের কৈশরের অনেক স্মৃতি আজ ভীড় করছে মনে। গলঘষিয়া নদীর তীর ঘেঁষে বেড়ে ওঠা বর্তমানের বর্ধিষ্ণু এই গ্রামটি তখন জংগলে ঢাকা ।এটি তখনো সত্যিকার অর্থে গ্রামের রূপ লাভ করে নি। জোয়ার ভাটার স্রোত থেকে বাঁচার জন্য এ অঞ্চলে ওয়াপদার বাঁধও নির্মিত হয় নি সে সময়।জোয়ারের পানিতে ভেসে যেতো পুরো এলাকা।মাটির দেয়াল ঘেরা বাড়িগুলো তাই জোয়ারের লেবেল থেকে আরো খানিকটা উঁচু করে বানানো হতো।ভাটার সময় পানি যখন খালের শাখাগুলো থেকে নামতো তখন কলিমাখালী গ্রামের প্রায় সবাই মাছ ধরতে নেমে পড়তো।হাত বাড়ালেই কাড়ি কাড়ি মাছ,তবে আহসানউদ্দীনকে এই কাজটি কখনো করতে দেননি তাঁর মা-বাবা। ছেলেকে লেখাপড়া শিখিয়ে বড় মানুষ বানাবেন এমনই ইচ্ছা তাদের।এ অঞ্চলে কোন স্কুল ছিল না,তাই দূরান্তে গিয়ে সেই আমলে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষা গ্রহণ করেছিলেন তিনি।শিক্ষার কারণেই মুন্সী তকমাটাও লেগেছিল নামের পেছনে।

বুকের ব্যথাটা যেন ক্রমশ বাড়ছে তাঁর।আজ জীবনের বিদায়ঘন্টার মুহূর্তটি হয়তো আঁচ করতে পারছেন তিনি। প্রচন্ড যন্ত্রণার মধ্যেই অতীতের নানা ঘটনা তাঁর মনে উঁকি দিয়ে যাচ্ছে!ছয় ফিটের বেশি দীর্ঘ আর ধবধবে ফর্সা গায়ের রঙ আহসানউদ্দীনের । যে কারণে যৌবনকালে অনেক কদর ছিল তাঁর ।তবে আহসানউদ্দীন এ সব নিয়ে কখনো ভাবেন নি।প্রথম জীবনে লেখাপড়া, তারপর কিছু দিন ছেলেমেয়ে পড়ানোর কাজ করলেও জীবন পরিক্রমা সেখানেই থেমে থাকে নি তাঁর। দূরদর্শী আহসানউদ্দীন দ্রুত পেশা বদল করে মন দেন ব্যবসায়।নিজের নৌকায় নিজের মাঝিদের নিয়ে গলঘষিয়া-ইছামতি পার হয়ে চলে যেতেন বসিরহাটে ।সেখান থেকে ডাঙা পথে যেতেন কোলকাতায়। মালামাল কিনে সড়ক পথে বসিরহাট হয়ে নৌকায় ফিরতেন বাড়ী।নদী পথে মাঝেমাঝে ডাকাতির মুখোমুখি হয়েছেন তবে কোন এক অলৌকিক ইশারায় বেঁচে গিয়েছেন প্রত্যেকবার।

একবার ইছামতি দিয়ে ফেরার পথে ডাকাতরা তার নৌকাটি প্রায় ধরে ফেলেছিল। মালামাল ভর্তি নৌকাটি বিকেল থেকেই অনুসরণ করে আসছিল পাঁচজনের ডাকাত দলটি।সন্ধ্যায় তাদের নৌকাটি একটা বড় ঘাটে খাওয়ার পানি নেওয়ার জন্য থামলে ; ডাকাতদের ছোট নৌকাটি একেবারে তাদের কাছাকাছি এসে ভীড়ে।আলাপ করে ভাব জমানোর চেষ্টা করে তারা। কোনদিকে যাবে, কখন রওয়ানা হবে এধরনের নানা প্রশ্ন করে তাদের গন্তব্য সম্পর্কে নিশ্চিত হতে চায়। গন্তব্য জানার পর বলে, আমাদের বাড়িও ওদিকে চলেন এক সাথে যাই। কিন্তু তাদের কথাবার্তায় সন্দেহ হয় আহসানউদ্দীনের।তিনি মাঝিদের বলেন, তোমরা ওদের বলো, আমরা রাতে যাবো না,কাল সকালে যাবো। এতে অনেকটা হতাশ হয়ে ওই নৌকার লোকগুলো ঘাট ছেড়ে চলে যায়।নৌকাটিতে অবস্থানকারী পাঁচজনেরই চেহারা ছিল ভয়ঙ্কর প্রকৃতির।তাদের চলে যাওয়ার পর মাঝিদের সাথে পরামর্শ করে সিদ্ধান্ত হয় যে,মাঝ রাতে চাঁদ উঠলে তারা নৌকাটি ছেড়ে যাবে এ ঘাট থেকে।তবে তাকাতরা যে এত সহজে ছাড়বার পাত্র ছিল না,সেটা তারা তখন একেবারেই বুঝে নি।

ঘন্টা চারেক ঘুমানোর পর, মাঝ রাতে নৌকাটি যখন তারা ছাড়লো, তখন পূব আকাশে অর্ধ বৃত্তাকার মায়াবী চাঁদটি চারদিকে তুমুল আলো ছড়িয়ে তার উপস্থিতি জানান দিচ্ছে ।ঘণ্টা খানেক চলার পর তারা দেখলো দূর থেকে একটি নৌকা তাদের দিকে ধেয়ে আসছে।তাদের বুঝতে অসুবিধা হল না যে,এটি সেই নৌকা যেটিকে তারা সন্ধ্যারাতে ওই ঘাটে দেখেছিলো। কিন্তু তখন আর তাদের করার কিছু ছিলো না।চাঁদের আলোয় দূর থেকেও তাদের হাতের লম্বা ধারালো রাম দাগুলো দেখা যাচ্ছিলো।জ্যোৎস্নার আলো পড়তে সেগুলো যেন আরো চিকচিক করে ওঠে। ডাকাতরা নৌকা থামানোর জন্য নির্দেশ দিচ্ছিলো বারবার। নির্দেশটি ভাষাহীন এমন এক ধরনের ভয়ঙ্কর শব্দ যা এ অঞ্চলের মাঝি আর ডাকাতরাই শুধু বুঝে। তবে এই নির্দেশে তারা থামলো না।কারণ তারা এরমধ্যেই বুঝে গেছে,এরা সেই ডাকাত দল যাদের হাতে ধরা পড়লে বাঁচার আর কোন আশা নেই। ধরা পড়লে তাই মৃত্যু অবধারিত। এ পর্যন্ত যারা এই ডাকাতদের হাতে ধরা পড়েছে তাদের মধ্যে খুব কম লোকই বেঁচে ফিরেছে ! এদের বিধান হলো সর্বস্ব কেড়ে নাও,তারপর গলাকেটে নদীতে লাশ ফেলে দাও। কোন সাক্ষি তারা কখনো রাখে না।তবে এরা সব দিন আর সব জায়গায় ডাকাতি করে না।মাসে দু-মাসে তারা একবার ডাকাতি করে,তাও যত্রতত্র নয় দাও বুঝে কোপ মারা আর কি!এদিন অবশ্য অনেক হিসেব নিকেশ করেই তারা এই নৌকাটিকে টার্গেট করেছে।একবার যদি এটাকে কব্জায় নিতে পারে তাহলে আগামী ছ-মাস তারা নিশ্চিন্তে বসে বসে খেতে পারবে।

বাঁচার আর কোন পথ দেখতে না পেয়ে আহসানউদ্দীন নিজেও মাঝিদের সাথে মিলে দাঁড় টানতে লাগলেন।এ যেন জীবনকে নিলামে তুলে ফলাফলের জন্য অপেক্ষা করা!সেটা তাই কেবল দাঁড় টানা নয়, জীবন বাঁচানোর জন্য মরণপণ লড়াইয়ে নামা!ডাকাতদের নৌকাটি অপেক্ষাকৃত ছোট ও খালি হওয়া সত্ত্বেও প্রায় ঘন্টা খানেক ধরে এই জীবনমৃত্যের খেলা চললো।ডাকাতরা বুঝে উঠতে পারছে না যে,মাল বোঝাই এত বড় একটি নৌকা কিভাবে তাদের সাথে পাল্লা দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে তরতর করে! ডাকাতদের মাথায় রক্ত উঠে যাচ্ছে ক্রমশ!তবে সেদিন ভাগ্য সহায় ছিলো আহসানউদ্দীন আর তাঁর নৌকার মাঝিদের । ইছামতি থেকে কালিগঙ্গায় ঢুকবার মুখে তাদের নৌকাটি হঠাৎ করেই প্রচন্ড এক ঘূর্ণি স্রোতের মুখে পড়ে গেলো।অন্যসময় হলে হয়তো এটা ঘটতে পারতো না। প্রচণ্ড অস্থিরতা আর ভীতির কারণে মাঝিরা স্রোতের গতিপথ সঠিকভাবে অনুধাবন করতে ব্যর্থ হয়। তবে এই অসাবধনতাই সেরাতে তাদের জীবনের ভাগ্য খুলে দেয়! মালামালে ভর্তি হওয়ায় তাদের বড় নৌকাটি কোন রকমে বেঁচে গেলো। কিন্তু পেছনে থাকা ডাকাতদের নৌকাটি আর তাল সামলাতে পারল না।ফলে আচমকা ঘূর্ণির মধ্যে পড়ে তাদের নৌকাটি ডুবে গেল। আহসানউদ্দীন ও মাঝিরা রক্ষা পেয়ে জীবন ভিক্ষাদানের জন্য আল্লাহর উদ্দেশ্যে সিজদায় পড়ে গেলেন।সিজদায় পড়ে তাদের গগণবিদারী কান্না শেষ রাতের নদীর জলবাতাস আর নিস্তরঙ্গ পরিবেশকেও ভারি করে তুললো ।এ যেন জীবন ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য আল্লাহর কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশের জন্য অন্য রকম এক নিবেদন।নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে বেঁচে যাওয়ায় তারা দিশেহারা পড়েছিল তখন। কিছু সময় আগে তাদের জীবনে যে ঘটনাটি ঘটেছে সেটা এখন আর ভয়ঙ্কর স্বপ্ন ছাড়া আর কিছু মনে হচ্ছে না তাদের!

মুমূর্ষু আহসান আহসানউদ্দীন ঘরের ভেতরে একবার চোখ মেললেন।নিজের সন্তানদেরকেও যেন ঠিকমতো চিনতে পারছেন না ।সারা শরীরে প্রচন্ড যন্ত্রণা। নিজের শরীরের ভারটা বহন করাও তাঁর কাছে অসহ্য হয়ে উঠেছে এখন। আবার চোখ বুঝলেন তিনি। মাঝ বয়সে একবার কুল্লা-বুধহাটার বিলে ঝড়ের মুখে পড়ে প্রাণ যেতে বসার ঘটনাটা মনে পড়লো । মনে দাগ কেটে যাওয়া ঘটনাগুলো একে একে ভীড় করছে তাঁর স্মৃতিতে।দিনের বেলা জমি কেনার টাকা নিয়ে মালিকের কাছে যাচ্ছিলেন তিনি।তখন আছরের সময়,রোদ ঝলমল আকাশটা হঠাৎ ভয়ঙ্কর কালো মেঘে ঢেকে গেলো।দু-তিন মাইল জুড়ে কোথাও কোন ঘরবাড়ি নেই।পুরো বিল জুড়ে শুধু লম্বা ঘাস আর কিছু দূর পরপর দু-একটা গেওয়া গাছ ছাড়া কিছু নেই। বিষয়টি নিয়ে ভাববার আগেই উঠলো মারাত্মক ঘূর্ণি ঝড়।প্রচন্ড ঘূর্ণি গোলাকার কালো ধোঁয়ার সৃষ্টি করে উঠে যাচ্ছে আকাশে।জীবন বাঁচাতে দ্রুত একটা বড় মাটির ঢিবির কাছে উপুড় হয়ে শুয়ে পড়লেন আহসানউদ্দীন।তার পৃষ্ঠদেশে ঝড়ের তান্ডবে উড়ে আসা গাছের ডালপালা আর শক্ত মাটির বড়বড় খণ্ডগুলো আঘাত করতে লাগলো ক্রমাগত।আধা ঘণ্টা পর যখন ঝড় থেমে গেলো,আহসানউদ্দীনের জামা-কাপড় ছিড়ে পুরো শরীর তখন রক্তাক্ত।বুদ্ধি করে শুয়ে পড়ার কারণেই সে যাত্রাও মরতে মরতে বেঁচে গিয়েছিলেন তিনি।সেখান থেকে জমির মালিকের বাড়িতে পৌঁছুতে ঘণ্টা খানেক সময়ের পথ।তবে আহত আহসানউদ্দীনের তিন ঘণ্টা লেগে গেলো ওই বাড়িতে পৌঁছুতে।গ্রামের হিসেবে সেটা তখন অনেক রাত।এই অবস্থায় তাঁকে দেখে জমি বিক্রেতা হাহাকার করে উঠে বলেছিলেন, আজ তোমার কিছু হলে আমিই তার জন্য দায়ী থাকতাম।

পৈতৃক সূত্রে প্রাপ্ত বিঘা দশেক জমি থেকে আজ আহসানউদ্দীনের ভূসম্পত্তির পরিমাণ গিয়ে দাঁড়িয়েছে পাঁচশ বিঘার ওপরে।সেই সাথে বিপুল বিত্তবৈভব তার জীবনকে কানায় কানায় ভরে দিয়েছে। পঁচিশ বিঘার বিশাল ভিটা বাড়িটির চারপাশ একবার হেঁটে আসতে ইচ্ছা করছে খুব।নিজের হাতে গড়া বাড়িটা আর একনজর দেখার ভাগ্য কি তাঁর হবে না কখনো? আজ জীবন তাকে ছুটি দেওয়ার জন্য এক পায়ে দাঁড়িয়ে।চোখের কোণ বেয়ে দু-ফোটা অশ্রু গড়িয়ে পড়লো তার।তখন শেষ রাত,সুবহে সাদেক হয়েছে অনেক্ষণ।ফজরের আযান শুরু হতে বেশি বাকি নেই। তিনি দেখলেন,তাঁর মা-বাবা দু-জনেই শিয়রের কাছে দাঁড়িয়ে।ইশারায় তাঁকে কাছে যেতে আহ্বান জানাচ্ছেন।

আহসানউদ্দীনের হাড্ডিসার দেহটায় একটা খিঁচুনি উঠলো।প্রাণপণ চেষ্টায় ঘরের চারদিকে আবারো একবার তাকানোর চেষ্টা করলেন তিনি।কিন্তু চোখের পাতা খুলতে পারলেন না।ক-ফোটা জল অর্ধনির্মিলিত চোখ থেকে গড়িয়ে পড়লো আবার। মসজিদ থেকে ভেসে আসলো আসসালাতু খাইরুম মিনাননাউম---আহসানউদ্দীনের ঘাড়টা বেঁকে গেলো।তিনি অনেক কষ্টে জীবনের শেষ নিশ্বাসটি ত্যাগ করলেন! এর সাথেই পরিসমাপ্তি ঘটলো একটা যুগের,একটা শতাব্দীর! ঘরে তখন তীব্র কান্নার রোল!

১৪.০১.২০১৯/ফাস্টনিউজ/এমআর/১৬.১০
অতিথি কলাম :: আরও খবর